Voice of 71 Voice of 71 Author
Title: বিদেশী সংবাদপত্রে মুক্তিযুদ্ধঃ ভোগান্তির উদ্দেশ্যে যাত্রা
Author: Voice of 71
Rating 5 of 5 Des:
পত্রিকার নাম: দি গার্ডিয়ান প্রকাশকাল: ০৫ জুন, ১৯৭১ প্রতিবেদক: এ বি ইউ অনুবাদ করেছেন: ফাহমিদুল হক শিরোনামঃ ভোগান্তির উদ্দেশ্যে যাত্রা ...
পত্রিকার নাম: দি গার্ডিয়ান
প্রকাশকাল: ০৫ জুন, ১৯৭১
প্রতিবেদক: এ বি ইউ
অনুবাদ করেছেন: ফাহমিদুল হক
শিরোনামঃ ভোগান্তির উদ্দেশ্যে যাত্রা

গত সপ্তাহে যখন আমি আগরতলা-সার্কিট-হাউসে ছিলাম, রাতের বেলায় আমার বেডরুমের জানালা কেঁপে উঠত; কারণ প্রতি রাতে সীমান্ত বরাবর পাকিস্তানি শেল বিস্ফোরিত হতো। আগরতলা হলো ত্রিপুরা রাজ্যের রাজধানী, পূর্ব পাকিস্তানের পাঁচটি জেলার সঙ্গে যে-রাজ্যটির সীমান্তরেখা আছে। দিনের বেলাতেও শেল বিস্ফোরন হতো যদিও তার সংখ্যা কম ছিল। সীমান্তে অবস্থানরত গেরিলাদের উদ্দেশ্যেই এই বোমা নিক্ষেপ করা হতো, কিন্তু কোনো সন্দেহ নেই, এসব এলাকার গ্রামবাসীদের এলাকা ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য করার জন্য ভীতি-প্রদর্শনেও শেল ফাটানো হতো।

গত কয়েক দিনে যেহেতু সীমান্ত জুড়ে পাকিস্তানি সৈন্য-সংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, ভারতীয় রাজ্য ত্রিপুরা, পশ্চিম-বাংলা ও আসামে উদ্বাস্তুর সংখ্যা ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। পূর্ব-বাংলা থেকে প্রায় ৩০ লক্ষ শরণার্থী এখন ভারতে অবস্থান করছে। দু-মাস আগে ত্রিপুরার জনসংখ্যা ১৫ লক্ষ ছিল, বর্তমানে তার প্রায় অর্ধেক বৃদ্ধি পেয়েছে।

আশ্রয়-শিবির

ত্রিপুরায় ৫০০,০০০-এরও বেশি নিবন্ধীকৃত উদ্বাস্তু রয়েছে, এছাড়া অনিবন্ধীকৃত প্রায় ১০০,০০০ শরণার্থী আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে অবস্থান করছে। এ-পরিস্থিতিতে সাংঘাতিক খাদ্য-সমস্যা দেখা দিয়েছে এবং উন্নয়ন-প্রকল্পসমূহের গতি মন্থর হয়ে গেছে। এক হিসেবে অর্ধেক শরণার্থীকে অস্থায়ী আশ্রয়-শিবির প্রদান করা হয়েছে। অনেক স্কুল ও মন্দির ক্যাম্পে রূপান্তরিত হয়েছে, কিন্তু হাজার হাজার লোককে চাটাই- ও খড়-নির্মিত কুঁড়েঘরে থাকতে হচ্ছে। ঘরগুলোকে দেখে সুন্দর ও পরিচ্ছন্ন মনে হয়, কিন্তু ঝড়ে তা সহজেই উড়ে যেতে পারে। মধ্য-জুনে প্রবল বৃষ্টি হলে সেগুলো রা করা দায় হবে। হাজার হাজার পরিবার গাছতলায় ও খোলা জায়গায় অবস্থান করছে এবং সামনের সপ্তাহগুলোতে অনেক শিশু মারা যাবে।

আগরতলা থেকে ৭০ মাইল দক্ষিণে সাবরাম-এ ত্রিপুরার বৃহত্তম ক্যাম্পটি অবস্থিত। ২,০০০ জনসংখ্যার শহরটিতে এখন অধিবাসীর সংখ্যা পূর্বের চেয়ে কয়েকগুণ বেশি। গত মাসে প্রায় ৮০,০০০ লোক সাবরাম হয়ে এসেছে। ক্যাম্প থেকে কয়েক হাজার গজ দূরে ফেনী নদী পূর্ব-বাংলার সঙ্গে সীমানা নির্দেশ করছে। ভারতীয় তীরে একটি ছইওয়ালা ছোট্ট নৌকা বাঁধা। একদল বাচ্চ-কাচ্চা নদীর অপর পাশটা দেখছিল। 'ঐযে!' একজন চিৎকার করে উঠল, 'ঐযে ওরা যায়'। দু-জন পাকিস্তানি অফিসার একসময়ের-ডাকঘর-বর্তমানের-সেনাবাহিনী-ক্যাম্পের চত্বরের দিকে হেঁটে যাচ্ছিল। ওটা হলো রামগড় শহর। সেখানে অন্য কোনো শব্দ নেই। ডাকঘরের পেছনে বিস্তৃত খালি জায়গা। এরপর আংশিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত স্কুলভবন ও অর্ধেক বিধ্বস্ত মসজিদ। কাছেই, অল্পকিছু ঘর-বাড়ি দেখা যায়।

কলকাতা থেকে ৬০ মাইল দূরে এবং ভারতীয় সীমানার দু-মাইল ভেতরে ভয়াবহ দৃশ্য দেখা যায়, যেখানে হাজার হাজার মা কোলে শিশু নিয়ে রাস্তার ধারে খোলা আকাশের নিচে বসে আছে, রান্না-বান্না করছে অথবা ছায়ার নিচে বিশ্রাম নিচ্ছে। দুর্ভাগ্য তাদের মুখমণ্ডলেই লেখা রয়েছে। বিভিন্ন স্থানে লোকজন লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছে প্রতিদিনের ৪০০ গ্রাম চালের রেশনের জন্য। শরণার্থীদের বৃহৎ অংশই শিশু। অনাহারে শীর্ণ, নিরব, মনমরা বাচ্চাদের এক হৃদয়বিরাক দৃশ্য সেটা। এমন এক দুর্ভাগা জগতে তারা জন্ম নিয়েছে, যার জন্য তারা দায়ী নয়।

কিন্তু, বাচ্চারা আহত করলেও তাদের মুক্তিবাহিনীর বড়ো ভাইয়েরা সবাইকে উজ্জীবিত করে। সীমান্ত এলাকায় আগরতলা থেকে কয়েক মাইল দূরে আমি এক বনের প্রান্তে একটি মুক্তি ফৌজ ট্রেনিং-ক্যাম্পে এক ঘণ্টা কাটাই। লুঙ্গি ও শার্ট পরিহিতদের সশস্ত্র পাহারা পেরিয়ে আমাকে একটি কাঠের পুরনো ভবনের সামনে আনা হয়, যেখানে একজন তরুণের সঙ্গে দেখা হয়, যার বয়স বড়োজোর ১৮ বছর হবে। তিনি নিজেকে কমান্ডার হিসেবে পরিচয় দেন। তিনি ঢাকার মিলিটারির একাডেমির একজন সাবেক ক্যাডেট। তিনি তার নেতৃত্বাধীন কিছু যোদ্ধার সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেন যারা সবাই ছাত্র-বয়েসী, এবং শার্ট-লুঙ্গি পরিহিত। তাদের একজন রাইফেলের স্তূপ পাহারা দিচ্ছে। কমান্ডার যোদ্ধাদের দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের বর্ণনা দিচ্ছিলেন, পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে প্রতিদিনের যুদ্ধের কথা বলছিলেন। তিনি বিজয়ের ব্যাপারে আত্মপ্রত্যয়ী। কমান্ডার বললেন, 'মুক্তিযোদ্ধাদের মানসিক জোর প্রচণ্ড'। তিনি বারবার একথা বললেন। যখন আমি ড্রয়িংটা শেষ করলাম, তিনি এসে তা দেখলেন। (এই রিপোর্টের সঙ্গে একটি স্কেচ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়) 'তাকে সন্ত্রস্ত দেখাবেন না', কমান্ডার বললেন। 'তার চোখে আপনি অবশ্যই সাহসের চিহ্ন দেখাবেন। আমাদের মনের জোর খুবই বেশি'। ছেলেটাকে যেমন দেখাচ্ছিল, আমি তেমনই এঁকেছি। মনে হয় সে তার মায়ের কথা ভাবছিল।


About Author

Advertisement

Post a Comment

 
Top